মায়া সভ্যতার মায়ায়
Posted by fahim shakil on Monday, January 23, 2012
Under: ইতিহাস
মায়া
সভ্যতার লোকেদের, মানে মায়ানদের কথা শুনলে তোমরা এমনই অবাক হবে, ভেবেই কূল
পাবে না সেই চার হাজার বছর আগে কীভাবে তারা এত উন্নত হয়েছিল? যখন পৃথিবীর
মানুষরা বাড়িঘরই ঠিকঠাক বানাতে শেখেনি, কেবল আগুন জ্বালিয়ে খাবার সেদ্ধ করা
শিখেছিল, সেই সময় তারা কীভাবে পাথর দিয়ে তৈরি করেছিল বিশাল বিশাল সব
ঘরবাড়ি! আর সেই সব ঘরবাড়ি কতো বিশাল? তা আজকের দিনের প্রায় বিশ পঁচিশ তলা
বিল্ডিংয়ের সমান তো হবেই! যখন কেউ লিখতে-পড়তে তো দূরে থাক, অধিকাংশ জাতির
ভাষাই পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, তখন তারা তাদের ভাষায় এমনকি একরকম ক্যালেন্ডারও
বানিয়ে ফেলেছিল। চাঁদ, তারা, গ্রহ-নক্ষত্র নিয়েও তারা পড়াশুনা করত, যাকে
বলে কিনা জ্যোতির্বিদ্যা। শুধু তাই না, ওরা গান গাইত, কবিতা লিখত; রীতিমত
সাহিত্য চর্চা করতো! কী অবাক কাণ্ড, তাইনা? আরও একটা মজার কথা কি জানো,
পুরো আমেরিকা (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) মাহাদেশজুড়ে মায়া সভ্যতাই একমাত্র
প্রাচীন সভ্যতা, যাদের নিজস্ব লেখ্য ভাষা ছিল, যারা আমাদের মতই সুন্দর করে
পড়তে এবং লিখতে জানতো।
এই মায়া সভ্যতা আমাদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরের আরেক মহাদেশের একটি
সভ্যতা। তবে বহু দূরের হলে কী হবে, এই সভ্যতার গল্প এতই বিখ্যাত আর মজার,
সারা পৃথিবীর লোকের মুখে মুখে ফেরে সেই গল্প। এবং যারা দেশে বিদেশে ভ্রমণ
করে, মানে পর্যটকদের কাছে মায়া সভ্যতার নিদর্শন, মানে মায়ানদের শহর,
বাড়িঘর, পুরাকীর্তি আর আর সবকিছুই খুবই পছন্দের। এমন ভ্রমণপিপাসু মানুষ খুব
কমই আছেন, যিনি পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন, অথচ মায়া সভ্যতার নিদর্শন দেখতে
যাননি। বড় হলে তোমরাও হয়তো একদিন যাবে সেখানে, ওদের অদ্ভ‚ত সব কীর্তিকলাপ
দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হবে, আবার খুব মজাও পাবে। তার আগে চলো, আজকে ওদের যতো
গল্প আছে চটজলদি আজ জেনে নেই।
কিন্তু কীভাবে জন্ম হলো মায়া সভ্যতার? কীভাবেই বা এই সভ্যতা সেই আদিম যুগেও এতো বিকশিত হল, বা উন্নত হলো? এবার এসো সে সবই জেনে নেই। মায়া সভ্যতার মানুষজন প্রথম কবে এই এলাকায় এসেছিল তা জানা যায়নি। তবে খ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় ২০০০ হাজার বছর আগে, মানে ইংরেজি সাল গণনা শুরুরও প্রায় ২০০০ হাজার বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল) আগের মায়ান ভাষার লেখ্য রূপ পাওয়া গেছে। তার মানে, তারা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালেরও বহু আগে থেকে সেখানে বাস করে আসছিল। এই সময়ের আগে মায়ানরা ছিল যাযাবর। তারা খাদ্য, পানি এবং আশ্রয়ের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। কী অবাক লাগছে না? তোমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে কেন তারা তোমাদের আব্বু আম্মুর মত বাসায়, অফিসে বা বাজারে না গিয়ে খাবার আর আশ্রয়ের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত, তাই না? এর কারণ হল, তখনও পৃথিবীতে কোথাও অফিস কি বাজার তৈরি হয়নি, এমনকি তখনো ঘরবাড়িও তৈরি হয়নি। ওই অঞ্চলে মায়ানরাই প্রথম বাড়িঘর তৈরি করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে তারা ওই অঞ্চলে পশুপালন শুরু করে, আর বানাতে শুরু করে মাটি দিয়ে নানারকম তৈজসপত্র, যেমন থালা-বাসন, বাটি, হাঁড়ি-পাতিল প্রভৃতি। ফলে তারা পশু থেকে মাংস আর মাটি থেকে তৈরি তৈজসপত্র পেতে লাগলো। ফলে তাদের খাবার আর খাবার রাখার পাত্রের আর কোন অভাব রইলো না। যখন খাবারের চিন্তা আর রইলোই না, তখন আর যাযাবরের মতো বনে-জঙ্গলে এখানে-ওখানে ঘোরাঘুরি করারই বা কী দরকার? তারা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে ঘরবাড়ি বানিয়ে এক জায়াগাতেই বাস করতে শুরু করলো।
কিন্তু কীভাবে জন্ম হলো মায়া সভ্যতার? কীভাবেই বা এই সভ্যতা সেই আদিম যুগেও এতো বিকশিত হল, বা উন্নত হলো? এবার এসো সে সবই জেনে নেই। মায়া সভ্যতার মানুষজন প্রথম কবে এই এলাকায় এসেছিল তা জানা যায়নি। তবে খ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় ২০০০ হাজার বছর আগে, মানে ইংরেজি সাল গণনা শুরুরও প্রায় ২০০০ হাজার বছর (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল) আগের মায়ান ভাষার লেখ্য রূপ পাওয়া গেছে। তার মানে, তারা খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সালেরও বহু আগে থেকে সেখানে বাস করে আসছিল। এই সময়ের আগে মায়ানরা ছিল যাযাবর। তারা খাদ্য, পানি এবং আশ্রয়ের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। কী অবাক লাগছে না? তোমাদের মনে হয়তো প্রশ্ন জাগছে কেন তারা তোমাদের আব্বু আম্মুর মত বাসায়, অফিসে বা বাজারে না গিয়ে খাবার আর আশ্রয়ের জন্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত, তাই না? এর কারণ হল, তখনও পৃথিবীতে কোথাও অফিস কি বাজার তৈরি হয়নি, এমনকি তখনো ঘরবাড়িও তৈরি হয়নি। ওই অঞ্চলে মায়ানরাই প্রথম বাড়িঘর তৈরি করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে তারা ওই অঞ্চলে পশুপালন শুরু করে, আর বানাতে শুরু করে মাটি দিয়ে নানারকম তৈজসপত্র, যেমন থালা-বাসন, বাটি, হাঁড়ি-পাতিল প্রভৃতি। ফলে তারা পশু থেকে মাংস আর মাটি থেকে তৈরি তৈজসপত্র পেতে লাগলো। ফলে তাদের খাবার আর খাবার রাখার পাত্রের আর কোন অভাব রইলো না। যখন খাবারের চিন্তা আর রইলোই না, তখন আর যাযাবরের মতো বনে-জঙ্গলে এখানে-ওখানে ঘোরাঘুরি করারই বা কী দরকার? তারা যাযাবর জীবন ত্যাগ করে ঘরবাড়ি বানিয়ে এক জায়াগাতেই বাস করতে শুরু করলো।
মায়া সভ্যতা বিখ্যাত হয়ে আছে ওদের স্থাপত্যশিল্পের জন্য, ওদের তৈরি বিশাল বিশাল ঘরবাড়ি, ওদের তৈরি পিরামিড আর মূর্তিগুলোর জন্য। এখনও মায়া সভ্যতার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের তৈরি পিরামিড, ঘরবাড়ি, প্রাসাদ আর অট্টালিকা। আচ্ছা, ওদের কয়েকটা বিখ্যাত স্থাপত্যের নাম বলি তোমাদের, শোনো- চেচেন ইটজা, নর্থ আ্যাক্রপলিস, টিকাল, গুয়াতেমালা এন্ড বলকোর্ট আ্যাট টিকাল, এল মিরাডর।
শুধু তাই না, মায়ানরা সেই সময়েই গণিতে বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। অবশ্য তোমাদের মতো কঠিন কঠিন অঙ্ক ওরা করতে পারতো না, তখনো গণিতের এতোটা উন্নতিই হয়নি! তবে ‘শূণ্য’ আবিষ্কার কিন্তু প্রাচীন গণিতের খুব বড়ো এক আবিষ্কার। আর এ আবিষ্কারে মায়ানদেরও কিছুটা অবদান আছে। তবে তাদের আবিষ্কৃত ‘শূণ্য’ অন্যান্য সভ্যতায় তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, তাই তারা ‘শূণ্য’-র আবিষ্কারকও হতে পারেনি। শুধু গণিতে না, তারা জ্যোতির্বিজ্ঞানেও বেশ অবদান রেখেছিল; তারাই প্রথম খালি চোখেই গ্রহ নক্ষত্রদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করে হিসেব করে তাদের গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করেছিল।
এবার তোমাদেরকে মায়ানদের আরেকটি ভাল দিকের কথা বলি। তারা কিন্তু বেশ চুটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতো। আর ওদের বাণিজ্য ছিল মূলত কৃষি নির্ভর; তখন যে কল-কারখানা আবিষ্কারই হয়নি! ওদের প্রধান ফসল ছিল- আলু, ভুট্টা, সিম, স্কোয়াশ। আর ওরা ব্যবসা-বাণিজ্য করত বিনিময় প্রথায়, কেন? তখনো তো টাকা পয়সাই ছিল না। এছাড়া তারা লবন পাথরেরও বিকিকিনি করতো। আর তাদের এ বাণিজ্য নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতো।
এভাবে শিল্প-সাহিত্য-স্থাপত্য-ব্যবসা-বাণিজ্য-জ্ঞান-বিজ্ঞানে তারা উন্নতি সাধন করেছিল অনেক। কিন্তু কোনো কিছুই চিরদিন থাকে না, সবকিছুই একদিন ধ্বসে যায়, ধ্বংস হয়। প্রায় তিন হাজার বছর বীরদর্পে আমেরিকা দাপিয়ে বেড়ানো সভ্যতাও একদিন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো। ৯০০-১০০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মায়ান সভ্যতা বিপর্যয়ের মুখে পড়লো। তবে গবেষকগণ ঠিক ঠিক করে বলতে পারেননি, কী কারণে মায়া সভ্যতা ধ্বংস হয়েছিল। কেউ বলেন, মহামারীর কারণে, কেউ বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় খাবারের অপর্যাপ্ততার কারণে, আবার কেউ বলেন, পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে একসঙ্গে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল।
আর তারপর থেকেই মায়ানরা বিভক্ত হয়ে যেতে থাকে, অনেক দল অন্যান্য
জাতিগোষ্ঠীদের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। ১৪৫০ সালে পুরো মধ্য আমেরিকায় বিপ্লব
সংঘঠিত হয়। তখন মায়ানরা আরো ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে যায়। মায়া সভ্যতার কিছু
অংশ আবার স্প্যানিশরা দখল করে নেয়। মায়ানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-ব্যবসা-বাণিজ্যে
উন্নত হলেও সামরিক দিক দিয়ে, মানে অস্ত্র-শস্ত্রের দিক দিয়ে স্প্যানিশরা
ছিল অনেক এগিয়ে। তাই শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত মায়ানদের
অঞ্চলগুলো দখল করে নেয় স্প্যানিশরা। তবে মায়ানদের বেশ একটা সুবিধা ছিল,
ওদের কোনো রাজধানী ছিল না, ওদের প্রতিটি শহরই ছিল
বিজ্ঞান-সংস্কৃতি-বাণিজ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাই স্প্যানিশদের প্রতিটি মায়ান
শহরকেই আলাদা আলাদা করে জয় করতে হয়েছে। তাই সময়ও লেগেছে অনেক। শেষমেশ ১৬৯৭
সালে এসে পুরো মায়া সভ্যতাই স্প্যানিয়ার্ডদের দখলে আসে।
এরপরের ইতিহাস বলবো আরেকদিন। তবে এটুকু বলি, মায়ানরা এখনো পৃথিবীর বুক থেকে
হারিয়ে যায়নি। ওদের পূর্বপুরুষদের স্থাপনাগুলো যেমন সগৌরবে এখনো দাড়িয়ে
আছে পৃথিবীর বুকে, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে, তেমনি এখনও মধ্য আমেরিকায় প্রায়
৬০ লক্ষ মায়ান বাস করছে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে। আমরা যেমন
বাঙালীরা এখনো বাংলা নববর্ষ পালন করি, ওরাও ওদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মহা
ধুমধাম করে নববর্ষ পালন করে। তবে নরবলির মতো বর্বর প্রথা অবশ্য বিলুপ্ত
হয়েছে অনেক আগেই। এখন তারা আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে জীবন যাপন করছে,
একইসঙ্গে নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্যও বজায় রেখেছে। নিজেদের পূর্বপুরুষদের
শিকড়কে, ঐতিহ্যকে তারা হারিয়ে যেতে দেয়নি।
In : ইতিহাস