আমাদের ক্রিকেটের ৩ জন কিংবদন্তীর গল্প, যারা আমাদের ক্রিকেট দলে খেলেছেন অনেক দিন। যারা এখনো আমাদের ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন। কি, তাদের নাম শুনতে ইচ্ছে করছে? শুধু নাম শুনে আর কি হবে, চলো একেবারে তাদের গল্পই শুনে আসি।

আকরাম খান
আকরাম খানকে যারা চেনো, তারা তাকে চেনো আমাদের দলের নির্বাচক হিসেবে, তাই না? তিনি কিন্তু আমাদের দলের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় ছিলেন। আর তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন কি জন্যে জানো? ছক্কা মারার জন্য। এই উঁচু উঁচু সব ছয় মারতেন তিনি। আমাদের দেশের লিগে তো তিনি ছিলেন রীতিমতো বোলারদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে আকরাম খানের অভিষেক হয় ১৯৮৮ সালে। আর পাকিস্তানের সঙ্গে খেলাটাও হয়েছিলো তার নিজের জেলাতেই, চট্টগ্রামে। ছক্কা মারার জন্য বিখ্যাত হলেও তিনি কিন্তু আবার মিডিয়াম পেস বোলিংও করতেন। আর সেই প্রথম ম্যাচে তিনি আবার ব্যাটিংয়েই নেমেছিলেন ৮ নম্বরে। কিন্তু ৮ নম্বরে নেমেছেন বলে কি আর তিনি রান করবেন না? সেই আমলেই পাকিস্তানের বোলিংয়ের বিরুদ্ধেও তিনি মাত্র ৩৫ বলে করলেন ২১ রান। আউটও কিন্তু তিনি সেদিন হননি, অপরাজিত ছিলেন। ভাবছো, এ আর এমন কি? উঁহু, ওই তো ভুল করলে। তখন তো পাকিস্তান বাংলাদেশের জন্য রীতিমতো দুর্ধর্ষ প্রতিপক্ষ। তার উপর তখন এ-ও ছিলো ভীষণই মারকুটে ইনিংস। ভেবে দেখো, সেটা ছিলো ১৯৮৮ সাল। তখনো তো এখনকার মতো মারকুটে ক্রিকেট শুরুই হয়নি।


আকরাম খান তার ক্যারিয়ারের প্রথম ফিফটি করেন ১৯৯৭ সালে। কার বিরুদ্ধে জানো? ঐ পাকিস্তানেরই বিরুদ্ধে। আর তার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ৬৫ রান করেন কেনিয়ার সঙ্গে, ১৯৯৯ সালে। আর ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর সেই মহাকাব্যের কথা মনে আছে তো? সেদিনও কিন্তু তিনি পাকিস্তানের বোলারদের বেধড়ক পিটিয়ে ছিলেন। করেছিলেন ৪২ রান।

তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জৌলুসপূর্ণ টুর্নামেন্ট ছিলো ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি। ঐ টুর্নামেন্টে তিনি একাই করেছিলেন ১৮৫ রান। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ মুখোমুখি হয়েছিলো নেদারল্যান্ডের। এই কয়দিন আগেই যাকে আমরা হাসতে হাসতে হারালাম, ওরাও কিন্তু তখন আমাদের কঠিন প্রতিপক্ষই ছিলো। আর ফাইনালে যেতে হলে সেই ম্যাচে আমাদেরকে জিততেই হবে। ও, তোমাদেরকে তো বলাই হয়নি, সেই টুর্নামেন্টে আকরামই কিন্তু ছিলেন আমাদের অধিনায়ক। তো প্রথমে ব্যাট করে ওরা ১৭১ রানে অলআউট হয়ে গেলো। এদিকে আবার বৃষ্টির জন্য খেলার দৈর্ঘ্যও গেলো কমে। ৩৩ ওভারে করতে হবে ১৪১ রান। অথচ মাত্র ১৫ রানেই পড়ে গেলো আমাদের প্রথম ৪ উইকেট। সেখান থেকে একাই পুরো দলকে টেনে নিয়ে গেলেন তিনি। ৬৮ রান করে অপরাজিত তো থাকলেনই, দলকে জিতিয়ে দিলেন ৮ বল হাতে রেখেই। ঐ টুর্নামেন্টের ঐতিহাসিক সেই ফাইনালেও কিন্তু তিনি মারকুটে ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বৃষ্টিবিঘিœত সেই ম্যাচে জয়ের জন্য বাংলাদেশকে করতে হতো মাত্র ২৫ ওভারে ১৬৬ রান। সেদিন তিনি ২২ রান করেছিলেন মাত্র ২৭ বলে। আর সেই ফাইনালে যখন পাইলট ছক্কা মেরে আমাদের জয় নিশ্চিত করলো, তখনই নিশ্চিত হলো আমাদের প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলা। সেটা কার নেতৃত্বে হয়েছিলো? বললামই তো, সেই টুর্নামেন্টে আমাদের অধিনায়কও ছিলেন এই আকরাম খানই।


সব মিলিয়ে তিনটা আইসিসি ট্রফিতে খেলে তিনি প্রায় ৩৭ গড়ে করেছেন ৪৭৬ রান। শুধু একবার ভেবে দেখো, আমাদের এখনকার জাতীয় দলের কোনো ব্যাটসম্যানেরও এতো ভালো গড়ই নেই! আর বোলার হিসেবে তো ছিলেন আরো ভয়ংকর। মাত্র ১৯ গড়ে নিয়েছিলেন ১০ উইকেট।

ও, আরো একটা কথা। বাংলাদেশ প্রথম একদিনের ম্যাচ যেদিন জিতেছিলো, সেই গল্প জানো তো? কেনিয়ার সঙ্গে ১৯৯৮ সালের সেই ম্যাচেও তিনিই ছিলেন আমাদের ক্যাপ্টেন। আর রফিক আর আতহার আলী খান ওপেনিংয়ে শতরানের জুটি গড়ার পর তার ৩৯ রানের উপর ভর করেই সেদিন বাংলাদেশ ২৩৭ রানের বড়োসড়ো স্কোর গড়েছিলো।


মোটমাট ৪৪টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে তিনি ২৩.২৩ গড়ে করেছেন ৯৭৬ রান। অল্পের জন্য ১০০০ রান করতে না পারলেও করেছেন ৫টি ফিফটি। তবে বাংলাদেশ যখন টেস্ট খেলতে শুরু করলো, ততোদিনে তো তিনি একেবারে বুড়িয়েই গেছেন। তাই তার টেস্ট ক্যারিয়ার খুব একটা বড়োও হয়নি। মাত্র ৮টি টেস্ট খেলেছেন তিনি। আর সেগুলোতে তেমন একটা ভালোও খেলতে পারেননি। মাত্র ১৬ গড়ে করেছেন ২৫৯ রান।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল
আশির দশকে বাংলাদেশে ছিলো ফুটবলের জয়জয়কার। এখন তোমরা যেমন ক্রিকেটের পাগল, তখন সবাই ছিলো তেমনি ফুটবলের পাগল। আর তাই বুলবুলও মূলত ফুটবলই খেলতেন। তিনি খেলতেন ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে। আর তখন ভিক্টোরিয়াও ছিলো শীর্ষস্থানীয়ই একটি ক্লাব। পাশাপাশি আজাদ বয়েজে তিনি ক্রিকেটও খেলতেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে  এক ফুটবল ম্যাচে তার হাঁটুর লিগামেন্ট গেলো ছিঁড়ে। আর তখনই তিনি ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেট খেলার পাকাপাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। খালি একবার চিন্তা করে দেখো, সে সময় যদি তার হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে না যেতো, আর তিনি ফুটবলই খেলতে থাকতেন, তবে আমাদের ক্রিকেটের কী ক্ষতিটাই না হতো! কী ক্ষতি হতো ভাবছো? আগে তাহলে বুলবুলের গল্প শোনো, তবেই বুঝবে!

বাংলাদেশের পক্ষে তার ওয়ানডে অভিষেক হয় ১৯৮৮ সালে ভারতের বিপক্ষে। ১৯৯৭ সালের সেই আইসিসি ট্রফিতে বুলবুলের পারফর্মেন্সও কিন্তু খুবই ভালো ছিলো। দুইটি ফিফটিসহ ৩১ গড়ে ২১৭ রান করে তিনিই ছিলেন সেই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। আর এই দুই ফিফটির একটি আবার ছিলো সেমিফাইনালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। আর সেই ঐতিহাসিক ফাইনালে তো তিনি ছিলেন একেবারে রণমূর্তিতে! খেলেছিলেন ৩৭ বলে ৩৭ রানের একটি ঝোড়ো ইনিংস।


তবে তার ক্যারিয়ারের সব কারিশমা তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন আমাদের ক্রিকেটের স্বর্ণ যুগের জন্য। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে তিনিই ছিলেন আমাদের অধিনায়ক। আর তার অধিনায়কত্বেই রচিত হয়েছিলো পাকিস্তান বধের সেই অমর ক্রিকেট কাব্য। ভাবছো, তিনি তো ব্যাটিং-বোলিংয়ে করেননি তেমন কিছুই। কিন্তু দলকে নেতৃত্ব দেয়ার ব্যাপার আছে না? ওটাই কিন্তু দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কঠিন কাজ। আর সেই ম্যাচে বুলবুল কিন্তু একটা অসাধারণ রান আউটও করেছিলেন।


বুলবুল তার জীবনের, এবং আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসেরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন ২০০০ সালের নভেম্বরে। ১৩ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ-ভারতের টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আমাদের দেশের ক্রিকেট টেস্ট আঙিনায় প্রবেশ করলো। আর সেই প্রথম ম্যাচেই বুলবুল একাই ব্যাটিং করলেন প্রায় ৯ ঘণ্টা! যখন আউট হলেন, তখন তার নামের পাশে রান ১৪৫। কোনো দেশের প্রথম টেস্টে যেটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। তার সেই ইনিংসের উপর ভর করে বাংলাদেশ তাদের প্রথম টেস্ট ইনিংসেই করলো কাঁটায় কাঁটায় একেবারে ৪০০ রান।


তবে তিনি টেস্টে তার এমন অসাধারণ ফর্ম পরে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তারপরও তার ফর্ম কখনোই একেবারে ফেলে দেয়ার মতোও ছিলো না। ১৩ টেস্টে তিনি ২১.২০ গড়ে রান করেছিলেন ৫৩০, যাতে সেই ক্লাসিক সেঞ্চুরি ছাড়াও ছিলো আরো দুটি ফিফটি। আর ৩৯ ওয়ানডেতে ২৩.৩৫ গড়ে করেছিলেন ৭৯৪ রান। ওয়ানডেতে অবশ্য তিনি কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি, তবে ৩টি ফিফটি করেছিলেন। তারপরও তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। কারণ, তখন বাংলাদেশ দলকে তারুণ্য নির্ভর করে সাজানো হচ্ছিলো। আর তাই বুলবুলকে সরে যেতে হলো। আর অভিমানে তিনিও একেবারে অবসরই নিয়ে নিলেন। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটিতে জিওফ লসন আর মাইকেল ¯ø্যাটারের মতো ক্রিকেটারদের সঙ্গে কোচ কাম ক্রিকেটার হিসেবে খেলতে লাগলেন।

কিন্তু দেশ ছেড়ে কি আর বুলবুল বেশিদিন বাইরে থাকতে পারেন? ২০০৬ সালে আবার ফিরে এলেন দেশের টানে। ততোদিনে কোচিংয়ের উপর তার অনেকগুলো কোর্সও করা হয়ে গেছে। দেশে এসে আবাহনীর কোচিংয়ের দায়িত্ব নিলেন। নিয়েই ৭ বছর পর আবাহনীকে প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জেতালেন। একমি ল্যাবরেটরিজকে জেতালেন কর্পোরেট লিগ। ইচ্ছে ছিলো দেশের কোনো দলের কোচিং করাবেন। কিন্তু তা আর হলো না। শেষ পর্যন্ত তাকে আবার দেশ ছাড়তে হলো। তিনি এখন থাকেন মালয়েশিয়াতে। সেখানে থেকে চিন, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ আরো কয়েকটি সহযোগী ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে কাজ করছেন।




মোহাম্মদ রফিক

১৯৮৫ সাল। বাংলাদেশ স্পোর্র্টিং ক্লাবে একটা ছেলে বাঁহাতি পেসার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলো। আর ৩ বছরের মাথায়ই ছেলেটা সুযোগ পেয়ে গেলো তখনকার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেট ক্লাব বাংলাদেশ বিমানে। সেখানে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার ওয়াসিম হায়দার তার বাঁহাতি স্পিন দেখে তাকে বললো পেস বোলিং ছেড়ে স্পিন বল করতে। দলের জন্য তখন স্পিন বোলিংটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ভাগ্যিস, ওয়াসিম হায়দারের পরামর্শ মেনে ছেলেটা স্পিন বল করতে শুরু করেছিলো। নয়তো যে বাংলাদেশ তাদের ইতিহাসের সেরা স্পিনারকেই পেতো না। কারণ, সেই ছেলেটাই তো আমাদের মোহাম্মদ রফিক!

১৯৯৭ সালে আমাদের আইসিসি জয়ের অন্যতম নায়কও কিন্তু এই রফিকই। তিনি সেই টুর্নামেন্টের সবোচ্চ উইকেট শিকার ছিলেন। মাত্র ১১ গড়ে একাই নিয়েছিলেন ১৯ উইকেট। আর তার স্পিন পার্টনার এনামুল হক মনি নিয়েছিলেন ১২টা উইকেট। দুইজন মিলে যে কী ভয়ংকর একটা স্পিন অ্যাটাক তৈরি করেছিলেন! প্রতিপক্ষদের তো রীতিমতো তারা ভড়কে দিয়েছিলেন! সেমিফাইনালে তো মাত্র ২৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে তিনি একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন স্কটল্যান্ডকে। আর ফাইনালে স্টিভ টিকোলোর ১৪৭ রান সত্বেও যে ওরা ২৪১ রানের বেশি করতে পারেনি, তারও কারণ ছিলেন তিনিই। নিয়েছিলেন ৩টি উইকেট। তারমধ্যে ছিলো টিকোলো আর ওদুম্বের প্রায় দেড়শ রানের জুটি ভাঙা ওদুম্বের উইকেটটিও। আর পরে ব্যাটিংয়ে নামার সময় তাকে ওপেনিংয়ে পাঠানো হয় কেনিয়ান বোলারদের বেধড়ক পেটানোর জন্য। আচ্ছা, এটা তো জানোই যে রফিক মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবেও খুব জনপ্রিয় ছিলো। একবার তো টেস্টে তিনি এক ওভারে কোনো রান করেননি দেখে ধারাভাষ্যকাররা যাকে বলে রীতিমতো অবাকই হয়ে গিয়েছিলো। ‘রফিক মেডেন ওভার দিলো!’ তবেই বোঝো, রফিক কেমন মারকুটে ব্যাটসম্যান! আর সেদিন তো ওপেনিংয়ে নেমে রফিক দুইটা বিশাল বিশাল ছক্কাই মেরে দিলো। মাত্র ১৫ বলে করলো ২৬ রান।


কেনিয়ার সঙ্গে আমাদের প্রথম ওয়ানডে জয়ের কথা বলেছি না? সেই ম্যাচে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ কে হয়েছিলো জানো? আর কে, আমাদের রফিক। সেদিন ওপেনিংয়ে নেমে কেনিয়ান বোলারদের পিটিয়ে আধমরা করে ৭৭ রানের একটা দুর্ধর্ষ ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। পরে আবার বোলিংয়েও নিলেন ৩ উইকেট। আর কে হবে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, বলো?


ঐ মারকুটে ব্যাটিং আর কিপটে বোলিংয়ের জন্য তিনি ছিলেন বিখ্যাত। আর সেটাই তার কাল হয়ে দাড়ালো। তার গায়ে ‘ওয়ানডে স্পেশালিস্ট’র তকমা লেগে গেলো। প্রথম টেস্টে দলে থাকলেও পরে আর টেস্ট দলে তার জায়গাই হচ্ছিলো না। টেস্ট দলে আবার জায়গা পেলেন ২০০২ সালে, দেশের মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজে। আর প্রথম দানেই কেল্লা ফতে। প্রথম সুযোগেই গুণে গুণে ৬টি দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেট পুরলেন ঝোলায়। এরপর থেকেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশ দলের বোলিংয়ের প্রধান অস্ত্র। শুধু ইনিংসে ৫ উইকেটই নিয়েছেন মোটমাট ৭ বার। একবার তো অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে জিতিয়েই দিয়েছিলেন। আরেকবার তো তার বোলিং জাদুতে পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হারিয়েই দিচ্ছিলো। সেই টেস্টের শেষে তো সুজন আর আশরাফুল মাঠ থেকে বের হয়েছিলো কাঁদতে কাঁদতে। আমাদের প্রথম টেস্ট জয় যে হাতের মুঠোতে এসেও বেরিয়ে গেলো! সেদিন অবশ্য রফিক দেখিয়ে দিয়েছিলো, কিংবদন্তী ক্রিকেটাররা কতোটা উদার মনের হয়। পাকিস্তান তখন দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করছে। ওদের ৯ উইকেট পড়ে গেছে। বাংলাদেশের জিততে লাগে আর মাত্র ১টা উইকেট। ব্যাটিংয়ে ইনজামাম, আর নন-স্ট্রাইকে উমর গুল। রফিক বল ডেলিভারি দেয়ার আগেই ক্রিজ থেকে বের হয়ে গেলো উমর গুল। রফিক কিন্তু তখন নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তের উইকেট ভেঙে দিলেই গুল আউট হয়ে যায়, আর বাংলাদেশও ম্যাচ জিতে যায়। কিন্তু রফিক সেই কাজ করলেন না, তিনি বল না করে উমর গুলকে বললেন ক্রিজে ফেরত আসতে। পরে সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞেস করলো, আপনি কেন উমর গুলকে আউট করলেন না? রফিক বললেন, আমি চাইনি, আমাদের প্রথম টেস্ট জয়টা এরকম খারাপভাবে আসুক। অথচ অলক কাপালির আউটটা কিন্তু ওরা একরকম চুরি করেই নিয়েছিলো। ওর ব্যাটে লেগে বল ড্রপ খাওয়ার পর ধরেও ওদের উইকেট কিপার রশিদ লতিফ এমনভাবে আবেদন করলো, যেনো বল ড্রপ খায়-ই নি। আর আম্পায়ারও ওর ধোঁকায় বোকা বনে দিয়ে দিলো আউট।

২০০৭ বিশ্বকাপে রফিক একাই নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। আর তাঁরই নেতৃত্বে রাজ্জাক আর সাকিবকে নিয়ে তৈরি হয়েছিলো এক দুর্ধর্ষ বাঁহাতি স্পিন ত্রয়ী। যাদের কাছে নুয়ে পড়েছিলো ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্ধর্ষ ব্যাটিং আক্রমণও। এর আগে ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম বিশ্ব একাদশের একটা সুপার সিরিজ হয়। আর তাতে বিশ্ব একাদশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। আর ২০০৭ সালে এশিয়া একাদশ আর আফ্রিকা একাদশের ম্যাচ খেলার সময় তো এশিয়া একাদশের হয়ে ৪ উইকেট নিয়ে এশিয়াকে একটা ম্যাচ তিনি একরকম একাই জিতিয়ে দেন।

২০০৮ সালে রফিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। আর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার শেষ টেস্টেই তিনি নেন তার ১০০তম টেস্ট উইকেট। বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে ও ওয়ানডেতে ১০০০ রান আর ১০০ উইকেট নেয়া প্রথম অলরাউন্ডারও তিনি। ওয়ানডেতে তার মোট রান ১১৯১, উইকেট ১২৫টি। আর টেস্টে তার মোট রান ১০৫৯, উইকেট ঠিক ১০০টি।


তবে রফিক কিন্তু এখনো তার খেলা শেষ করেননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও এখনো তিনি জাতীয় লিগে খেলে যাচ্ছেন। গত বছরও তো বিগ বস টি-টুয়েন্টি প্রিমিয়ার লিগের ফাইনালে আবাহনীকে এনে দিয়েছেন এক অসম্ভব জয়। সবাই যখন ধরে নিয়েছেন, আবাহনী হেরেই গেলো, তখনই তার ব্যাট প্রতিপক্ষ বোলারদের দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে আবাহনীকে এনে দিয়েছে এক অভাবনীয় জয়!